Thursday, 24 November 2016

উলা বীরনগর – ভুলে যাওয়া অট্টালিকা ও মন্দির

বাংলার সমতলভূমির মধ্যে পাথরের যোগান সবসময়ই কম ছিল। সূতরাং না থামা স্থাপত্যশিল্প অন্য কোন মাধ্যমের সাহায্য নিয়েছে আর তা হলো কাদামাটি যা পুড়িয়ে পোড়ামাটি তৈরি করা হতো। এটা মন্দির স্থাপত্যের নতুন উপাদান। এই উপাদানে তৈরি মন্দির অবশ্যই মন্দির স্থাপত্যের নতুন উন্নয়ন ও স্বতন্ত্র গড়নের। উঁচু চূড়াবিশিষ্ট নয়, কিন্তু সাধারণ বসতবাড়ীর বাঁকানো ছাদের গড়ন শীঘ্রই বাংলার মন্দির স্থাপত্যের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে গেল। বাংলার কিছু কিছু পুরানো ইঁটের মন্দির এই ধরনের ছাদের তৈরি হয়েছিল ও তাদের নাম হলো বাংলা-মন্দির। শীঘ্রই এই স্থাপত্যের আরও অনেক মন্দির সুনির্মিত হলো দুটো বাংলা-মন্দির জোড়া দিয়ে যার নাম হয় জোড়া-বাংলা স্থাপত্যশৈলী। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকটা বাংলা-মন্দির ও জোড়া-বাংলা মন্দির টিকে রয়েছে যা এখনও দেখা যায়। যেতে হবে উলা বীরনগরের মিত্র-মুস্তাফিদের পারিবারিক মন্দিরে যা পশ্চিমবঙ্গে জোড়া-বাংলা মন্দিরের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বীরনগরের ইতিহাস অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগের যখন জায়গাটাকে লোকে উলা বলে জানতো। সেই সময় স্থানীয় জমিদার রামেশ্বর মিত্র খ্যাতির আলোকে আসেন যখন তিনি রাজস্ব আদায়কারী ও হিসাবরক্ষক হিসাবে বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ ও নবাব মুর্শিদ কুলি খানের রাজদরবারে নিযুক্ত হ’ন। আস্তে আস্তে এই পরিবার রামেশ্বর মিত্রর দৌলতে অভিজাত খেতাব ‘মুস্তাফি’ পান খোদ মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে যা পরবর্তীকালে তাঁদের বংশানুক্রমিক পদমর্যাদা হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

মিত্র-মিস্তাফিরা শীঘ্রই বড় বড় অট্টালিকা ও মন্দির স্থাপন করতে শুরু করেন ফলে গ্রাম্য উলা ছোট হলেও বর্ধিষ্ণু জনপদে পরিনত হয়। হুগলী নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথে উলা তার শ্রী হারায়। উলার পতনের আরও অগ্রগতি হয় যখন মিত্র-মুস্তাফি পরিবার তাঁদের বাসস্থান হুগলীর সুখারিয়া ও শ্রীপুরে নিয়ে আসেন। উলার সোনালী দিনগুলো একেবারে শেষ হয়ে গেল 1857 সালের মহামারীর প্রদুর্ভাবে।

উলার স্বর্ণালী দিনগুলির গল্প সম্পূর্ণ হয় না যদি মহাদেব মুখার্জীর দুঃসাহসিক কাজের কথা না বলা হয়, যিনি অষ্টাদশ শতাব্দীতে কুখ্যাত ডাকাত বৈদ্যনাথ ও বিশ্বনাথকে পরাজিত করেন। এই বীরত্বের কাজের জন্য উলার নাম হয় বীরনগর।

কিছু মন্দির ছাড়া উলায় মিত্র-মুস্তাফি ও মুখার্জীদের অট্টালিকা ও অন্যান্য সবই ধুলিসাত হয়ে গেছে। দৃষ্টি আকর্ষক জোড়া-বাংলা মন্দির পুরানো দিনের দ্যুতিময় ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। ধনুকাকৃতি একটা গেটের ভেতর দিয়ে প্রথমেই পাওয়া যাবে মিত্র-মুস্তাফির বাড়ী। ডানহাতে পড়বে চন্ডীমন্ডপ যেখানে আজও দুর্গাপুজো হয়। আগে চন্ডীমন্ডপের ছাদ কাঠের ছিল কিন্তু বর্তমানে টিনের শীট লাগিয়ে ছাওয়া হয়েছে। তবে কাঠের ওপর কিছু সুন্দর কাজ আজও রয়ে গেছে। খানিকটা গিয়েই দেখা যাবে জোড়া-বাংলা মন্দির যেখানে তিনটি ধনুকাকৃতি প্রবেশদ্বার আছে ও সামনের দিকে অনেক টেরাকোটার প্যানেল আছে যার মধ্যে কৃষ্ণলীলা, রামায়ন, দেবদেবীর সামাজিক জীবনের ছবি উল্লেখযোগ্য। বীরনগরে একটা বারো মন্দির এলাকা রয়েছে যার নাম দ্বাদশ শিব মন্দির। এলাকায় অনেক ভাঙা মন্দিরও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বীরনগর বিখ্যাত লেখক রাজশেখর বসুর (পরশুরাম) জন্মস্থান কিন্তু এখন তার কোনও অস্তিত্ব নেই।



No comments:

Post a Comment