Tuesday, 22 November 2016

কৃষ্ণচন্দ্র রায় দেব মন্দির, উলা বীরনগর, নদিয়া

কৃষ্ণচন্দ্র রায় দেব মন্দির, উলা বীরনগর, নদিয়া

শিয়ালদহ-কৃষ্ণনগর রেলপথে বীরনগর একটি স্টেশন । কলকাতা থেকে রেলপথে দূরত্ব ৮১.৬ কি. মি. । বীরনগর স্টেশন থেকে ২ কি. মি. পূর্ব দিকে উলার মুস্থাফি পাড়া । এই পাড়ার মিত্র মুস্থাফিদের রাধাকৃষ্ণের জোড়বাংলা মন্দিরটি বিখ্যাত । মন্দিরটি টেরাকোটা অলংকরণে অলংকৃত ।
বীরনগরের প্রাচীন নাম উলা । উলা নামকরণ সম্পর্কে নানান লোকশ্রুতি প্রচলিত আছে । উলুবন পরিষ্কার করে প্রথম বসতি স্থাপিত হয় বলে নাম হয় উলা । আবার অনেকে বলেন এই গ্রামের প্রাচীন ও বিখ্যাত দেবতা উলাই চণ্ডীর নামানুসারে নাম হয় উলা । এখানে একসময় গ্রামবাসীদের চেষ্টায় এক দুর্ধর্ষ ডাকাতদল ধরা পড়লে ইংরেজ সরকার উলার নতুন নামকরণ করেন বীরনগর অর্থাৎ বীরদের নগর ।
উলার প্রাচীন জমিদার মুস্তৌফি বংশের প্রতিষ্ঠাতা রামেশ্বর মিত্র মুর্শিদকুলী খাঁর রাজত্বকালে বাংলার মুস্তৌফি (= নায়েব কানুনগো ) পদে নিযুক্ত হন । তিনি ১৬৯৪ খ্রীষ্টাব্দে মুস্তাফি পাড়ায় তাঁর বসতবাড়ির কাছে রাধাকৃষ্ণের একটি সুন্দর জোড়বাংলা মন্দির নির্মাণ করেন । দুটি 'দোচালা' বা 'একবাংলা' জোড়া দিয়ে এ ধরণের মন্দির তৈরি হয় বলে এই স্থাপত্যশৈলীর নাম 'জোড়বাংলা' । মন্দিরটির সামনের দিকে পোড়ামাটির প্রতিষ্ঠা-ফলকের পাঠ হল :
অঙ্গৈককালেন্দুমিতে
শকাব্দে ১৬১৬ কায়স্থ
কায়স্থহবেষ ধর্ম্মঃ ।
যো নির্ম্মমে শ্রীহরিযুগ্ম ধাম
শ্রীযুত রামেশ্বরমিত্রদাস ।

অর্থাৎ ১৬১৬ শকাব্দে ( ১৬৯৪ খ্রীষ্টাব্দে ) কায়স্থকুলোদ্ভব শ্রী রামেশ্বর মিত্র শ্রীহরির এই যুগ্মগৃহ নির্মাণ করলেন । এখানে 'অঙ্গ' = ছয়, 'এক' = এক, 'কাল' = ছয়, 'ইন্দু' = এক ধরে অঙ্কের বামাগতি নিয়মানুসারে ১৬১৬ শকাব্দ হয়েছে । মন্দিরে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ নিত্যপূজিত । মন্দিরের কৃষ্ণ বিগ্রহটি রামেশ্বর মিত্র প্রতিষ্ঠিত । রাধিকা মূর্তিটি কোন এক সময়ে চুরি গেলে পুনরায় অন্য মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় ।

ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত, পশ্চিমমুখী এই মন্দিরের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা যথাক্রমে ৬.৭ মি. , ৬.৭ মি. এবং ৭.৬ মি. । প্রতিটি দোচালার প্রস্থ ৩.৩ মি. । প্রথম দোচালাটি অলিন্দ এবং দ্বিতীয় দোচালাটি গর্ভগৃহ হিসাবে ব্যবহৃত হয় । উৎকৃষ্ট টেরাকোটা অলংকারে মন্দিরটি অলংকৃত । পাদপীঠ সংলগ্ন দেওয়াল থেকে আরম্ভ করে সামনের দিকের প্রায় সর্বত্রই পোড়ামাটির অলংকরণ দেখা যায় । কারিগরি নৈপুণ্যে সেগুলি নদিয়া জেলার টেরাকোটা মন্দিরগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের তুল্য হলেও অপটু হাতের সংস্কারে ও রঙের প্রলেপে তা এখন অনেকটাই ম্লান । বাইরের দেওয়ালে, ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন দুটি অনুভূমিক সারির নিচের সারিতে টেরাকোটায় পালকিবাহিত বাবু ও রক্ষকগণ, নৌকাভ্রমণ, মুঘল যোদ্ধা, বানিজ্যতরী, মৃগয়া প্রভৃতি সামাজিক চিত্র ও উপরের সারিতে একটানা হংসশ্রেণী উৎকীর্ণ আছে । বাইরের ত্রিখিলান প্রবেশপথের তিনদিক ঘিরে কুলুঙ্গিতে নিবদ্ধ এক সারি মূর্তি-ভাস্কর্যের মধ্যে কৃষ্ণলীলা, রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন ও শিবদূর্গা প্রভৃতি পৌরাণিক দেবদেবীই প্রধান । বাঁ দিকের স্তম্ভের গায়ে কার্তিক-গনেশসহ মহিষমর্দিণী মূর্তিটি সুন্দর । দেওয়ালের বাকি অংশে ফুলকারি নকশা দ্বারা অলংকৃত । গর্ভগৃহে ( দ্বিতীয় দোচালা ) প্রবেশপথের উপরেও টেরাকোটার কিছু কাজ আছে । সেখানে, খিলানশীর্ষের দুপাশে দুটি লম্ফমান সিংহ দৃষ্টি-আকর্ষণী ।

মিত্র মুস্তাফিদের কাঠের তৈরি কারুকার্যশোভিত একটি দুর্গামণ্ডপ ছিল । শোনা যায় সেই সময় এই দুর্গামণ্ডপটি দেখার জন্য বাংলার বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক লোক এখানে হাজির হত । অনেক দিন হল সেটি একপ্রকার বিনষ্ট । শুধু কাঠের ওপর খোদাই করা কয়েকটি থাম বা কড়ি ইঁটের তৈরি নতুন দুর্গামণ্ডপে রাখা আছে । কীটপতঙ্গের অত্যাচারে সেগুলিও এখন জীর্ণ-দীর্ণ ।

উপরোক্ত মন্দিরে যেতে হলে শিয়ালদহ থেকে লালগোলা প্যাসেঞ্জার বা কৃষ্ণনগর লোকালে উঠুন । নামুন বীরনগর স্টেশনে । স্টেশনের পূর্ব দিক থেকে টোটো বা রিকশায় উঠে পৌঁছে যান মন্দিরে ।






জোড়বাংলা মন্দির, উলা বীরনগর

No comments:

Post a Comment